জন্ম নিবন্ধন সংশোধন ও নবায়ন ২০২৬

জন্ম নিবন্ধন সনদ — নতুন নিবন্ধন ও সংশোধনের সম্পূর্ণ গাইড ২০২৬

শিশু থেকে প্রাপ্তবয়স্ক — নতুন জন্ম নিবন্ধন এবং পুরনো সনদ সংশোধনের ধাপে ধাপে নির্দেশিকা

পড়তে সময় লাগবে: ৭ মিনিট ৬টি ধাপ জন্ম নিবন্ধন গাইড

জন্ম নিবন্ধন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

জন্ম নিবন্ধন সনদ বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের সর্বপ্রথম এবং সবচেয়ে মৌলিক পরিচয়পত্র। পাসপোর্ট করতে, NID তৈরি করতে, স্কুলে ভর্তি হতে, বিবাহ নিবন্ধনে এবং সরকারি সকল সেবায় এই সনদ প্রয়োজন। ২০২৪ সাল থেকে ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

bdris.gov.bd (Bangladesh Digital Registration Information System) পোর্টালের মাধ্যমে এখন নতুন নিবন্ধন, সংশোধন, ডুপ্লিকেট সনদ এবং যাচাইয়ের সকল কাজ অনলাইনে করা যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভায় সরাসরি যোগ দিতে হয়।

ডিজিটাল সনদ: ২০২৩ সাল থেকে ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন সনদ সকল প্রতিষ্ঠানে গ্রহণযোগ্য। কাগজের পুরনো সনদ ডিজিটাইজ করা না থাকলে সমস্যা হতে পারে।

কোন সেবার জন্য এই গাইড?

নতুন নিবন্ধন

শিশু জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে বিনামূল্যে নিবন্ধন

তথ্য সংশোধন

নামের ভুল, জন্মতারিখ, পিতা-মাতার নাম সংশোধন

ডুপ্লিকেট সনদ

হারিয়ে গেলে বা নষ্ট হলে নতুন কপি সংগ্রহ

ফি কাঠামো ২০২৬

সেবার ধরন ফি সময়কাল
জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে নিবন্ধন বিনামূল্যে ৭–১৫ কার্যদিবস
৪৫ দিন পরে, ৫ বছরের আগে নিবন্ধন ২৫ টাকা ১০–২০ কার্যদিবস
৫ বছরের পরে নিবন্ধন (প্রাপ্তবয়স্ক) ৫০ টাকা ১৫–৩০ কার্যদিবস
বাংলায় তথ্য সংশোধন ১০০ টাকা ৭–২০ কার্যদিবস
ইংরেজিতে তথ্য সংশোধন ১০০ টাকা ৭–২০ কার্যদিবস
ডুপ্লিকেট সনদ (বাংলা) ৫০ টাকা ৩–৭ কার্যদিবস
ডুপ্লিকেট সনদ (ইংরেজি) ১০০ টাকা ৩–৭ কার্যদিবস

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

নবজাতকের জন্য নতুন নিবন্ধন

হাসপাতালের ছাড়পত্র
জন্মের তারিখ ও সময় সহ
অবশ্যই প্রয়োজন
পিতা-মাতার NID কপি
উভয় পাশ স্ক্যান সহ
অবশ্যই প্রয়োজন
পিতা-মাতার বিবাহ সনদ
নিকাহনামা বা রেজিস্ট্রেশন
প্রযোজ্য ক্ষেত্রে
ওয়ার্ড কাউন্সিলরের প্রত্যয়নপত্র
বাড়িতে জন্ম হলে
বাড়িতে জন্মের ক্ষেত্রে

প্রাপ্তবয়স্কদের নিবন্ধনে অতিরিক্ত কাগজপত্র

SSC সার্টিফিকেট
জন্মতারিখ যাচাইয়ের জন্য
অবশ্যই প্রয়োজন
জাতীয় পরিচয়পত্র
১৮ বছরের উপরে হলে
অবশ্যই প্রয়োজন
পাসপোর্ট
থাকলে
প্রযোজ্য ক্ষেত্রে
চেয়ারম্যান/কাউন্সিলর সার্টিফিকেট
জন্মস্থান প্রমাণের জন্য
অবশ্যই প্রয়োজন

আবেদনের ধাপসমূহ (অনলাইন)

মনে রাখুন: bdris.gov.bd পোর্টালে আবেদনের পর চূড়ান্ত নিবন্ধন স্থানীয় কর্তৃপক্ষ (ইউনিয়ন পরিষদ/পৌরসভা) থেকে অনুমোদন করাতে হবে।
১

bdris.gov.bd পোর্টালে যান

বাংলাদেশ সরকারের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন পোর্টালে (bdris.gov.bd) প্রবেশ করুন। "নতুন নিবন্ধনের আবেদন" বা "সংশোধনের আবেদন" অপশন নির্বাচন করুন। প্রথমবার হলে একটি অ্যাকাউন্ট তৈরি করুন।

টিপ: মোবাইল ব্রাউজারের চেয়ে কম্পিউটার/ল্যাপটপ থেকে আবেদন করা সহজ।
২

আবেদন ফর্ম পূরণ

শিশুর নাম (বাংলা ও ইংরেজিতে), জন্মতারিখ, জন্মস্থান, পিতা-মাতার তথ্য এবং ঠিকানা সঠিকভাবে পূরণ করুন। বাংলা নামের ক্ষেত্রে বাংলা কীবোর্ড ব্যবহার করুন। সব তথ্য একাধিকবার যাচাই করুন।

সতর্কতা: জন্মতারিখে দিন, মাস ও বছর সঠিকভাবে দিন — ভবিষ্যতে সংশোধন কঠিন হয়।
৩

কাগজপত্র আপলোড

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র স্ক্যান করে আপলোড করুন। প্রতিটি ফাইল সর্বোচ্চ ৫ MB এর মধ্যে হতে হবে। JPG, PNG বা PDF ফরম্যাট সমর্থিত। স্ক্যান করা ডকুমেন্ট অবশ্যই স্পষ্ট ও পাঠযোগ্য হতে হবে।

৪

আবেদন জমা ও রেফারেন্স নম্বর সংগ্রহ

সব তথ্য যাচাই করে আবেদন জমা দিন। একটি আবেদন রেফারেন্স নম্বর (Application Reference Number) পাবেন — এটি প্রিন্ট করুন বা সংরক্ষণ করুন। এই নম্বর দিয়েই স্ট্যাটাস ট্র্যাক করা যাবে।

৫

স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন

মূল কাগজপত্র নিয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনের জন্ম নিবন্ধন কাউন্টারে যান। অফিসার কাগজপত্র যাচাই করে অনলাইনে অনুমোদন দেবেন। ফি পরিশোধ করুন (প্রযোজ্য হলে)।

গুরুত্বপূর্ণ: এই ধাপ ছাড়া ডিজিটাল সনদ তৈরি হবে না — অনলাইন আবেদনই যথেষ্ট নয়।
৬

ডিজিটাল সনদ ডাউনলোড

আবেদন অনুমোদনের পর bdris.gov.bd পোর্টাল থেকে QR কোড সহ ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন সনদ ডাউনলোড করুন। এটি প্রিন্ট করলে আইনত বৈধ সনদ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।

গুরুত্বপূর্ণ টিপস

সফল নিবন্ধনের জন্য

  • শিশুর নাম বাংলা ও ইংরেজি উভয়েই একই হওয়া উচিত (অনুবাদ নয়, উচ্চারণ অনুযায়ী)
  • জন্ম নিবন্ধন নম্বর ১৭ ডিজিটের হয় — পুরনো ছোট নম্বর আপডেট করান
  • পরিবারের সকল সদস্যের জন্ম নিবন্ধন ডিজিটাইজ করুন
  • অনলাইনে যাচাই করুন: bdris.gov.bd তে "জন্ম নিবন্ধন যাচাই" অপশনে
  • QR কোড ছাড়া সনদ নকল হতে পারে — সবসময় ডিজিটাল কপি ডাউনলোড করুন

সংশোধনের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা

  • নামের বানান সংশোধন করার আগে সকল শিক্ষাগত সার্টিফিকেটের সাথে মিলিয়ে নিন
  • জন্মতারিখ সংশোধনে NID, পাসপোর্ট ও শিক্ষাগত সার্টিফিকেটের তারিখ একই হতে হবে
  • পিতা-মাতার নাম সংশোধন অত্যন্ত জটিল — একাধিক প্রমাণ প্রয়োজন
  • সংশোধনের পর পোর্টাল থেকে নতুন ডিজিটাল সনদ পুনরায় ডাউনলোড করুন

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

জন্ম নিবন্ধন না থাকলে কি পাসপোর্ট হবে?
না। ই-পাসপোর্ট আবেদনের জন্য বৈধ জন্ম নিবন্ধন সনদ বাধ্যতামূলক। তবে ১৮ বছর বা তার উপরে বয়সীদের ক্ষেত্রে NID কার্ড দিয়ে পাসপোর্ট করা সম্ভব — কিন্তু ১৮ বছরের নিচে শিশুদের জন্য অবশ্যই জন্ম নিবন্ধন সনদ লাগবে।
পুরনো হাতে লেখা জন্ম নিবন্ধন কি এখনও গ্রহণযোগ্য?
২০২৪ সাল থেকে ডিজিটাল সনদ ছাড়া পুরনো হাতের লেখা সনদ অনেক সরকারি অফিসে গ্রহণ করছে না। তাই পুরনো সনদ থাকলে দ্রুত bdris.gov.bd পোর্টালে গিয়ে ডিজিটাইজ করুন।
শিশুর জন্ম নিবন্ধনে কতদিন সময় লাগে?
সাধারণত ৭–১৫ কার্যদিবস। তবে ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভার কার্যক্ষমতার উপর নির্ভর করে। শহরাঞ্চলে সিটি কর্পোরেশন অফিসে দ্রুত (৩–৭ দিন) পাওয়া যেতে পারে।
ডুপ্লিকেট জন্ম নিবন্ধন কীভাবে পাবো?
bdris.gov.bd পোর্টালে লগইন করুন বা রেজিস্ট্রেশন নম্বর জেনে "ডুপ্লিকেট সনদ" অপশন ব্যবহার করুন। ফি পরিশোধ করে ডিজিটাল কপি সরাসরি ডাউনলোড করা যাবে। অথবা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ থেকেও পাওয়া যাবে।
জন্ম নিবন্ধন সনদ অনলাইনে যাচাই কীভাবে করবো?
everify.bdris.gov.bd ওয়েবসাইটে গিয়ে ১৭ ডিজিটের নিবন্ধন নম্বর এবং জন্মতারিখ দিলেই যাচাই করা যাবে। QR কোড স্ক্যান করেও যাচাই করা যায়।
বিদেশে জন্মানো শিশুর জন্ম নিবন্ধন কোথায় করবো?
বিদেশে বাংলাদেশী দূতাবাসে (Bangladesh Embassy/High Commission) যোগাযোগ করুন। দূতাবাস অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে নিবন্ধন করতে সহায়তা করবে। দেশে ফেরার পরও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ থেকে নিবন্ধন করা সম্ভব।